কৃষিপণ্য বলতে ফসল চাষ, পশু ও পাখি পালন, মাছ উৎপাদন এবং বৃক্ষরোপণ থেকে প্রাপ্ত সব ধরনের উৎপাদনকে বোঝায়। কৃষির উপখাতগুলোকে সাধারণত ফসল, প্রাণিসম্পদ, বন ও মৎস্য—এই চার ভাগে বিভক্ত করা হয়। এসব উপখাত থেকে অর্জিত মোট দেশজ উৎপাদনকে (জিডিপি) কৃষি জিডিপি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এদিকে ১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরে দেশের মোট জিডিপির প্রায় ৫০ শতাংশই ছিল কৃষি জিডিপির অবদান। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১১ শতাংশে। কৃষির প্রতিটি উপখাতেও একই ধরনের আনুপাতিক হ্রাস পেয়েছে। বর্তমানে ফসল, প্রাণিসম্পদ, বন ও মৎস্য খাতের অবদান যথাক্রমে জিডিপির ৫ দশমিক ০৬, ১ দশমিক ৮১, ১ দশমিক ৭২ ও ২ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
শিল্প ও সেবা খাতের উচ্চ প্রবৃদ্ধির কারণে মোট জিডিপিতে কৃষি ও এর উপখাতগুলোর অংশ কমে গেছে। তবে দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদা পূরণে মোট কৃষি উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আত্মনির্ভরতার পথে কৃষি খাত উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। ১৯৭২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে খাদ্যশস্য উৎপাদন পাঁচ গুণ বেড়েছে। গত ৫২ বছরে খাদ্যশস্য উৎপাদনের দীর্ঘমেয়াদি বার্ষিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩ শতাংশ ছিল। এর ফলে উৎপাদন ১৯৭৩ সালের ১১০ লাখ টন থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৫০৩ দশমিক ৫৪ লাখ টনে পৌঁছেছে।
আর অন্যান্য ফসল, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উৎপাদনেও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটেছে। দেশীয় উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি সত্ত্বেও প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য, ভোজ্যতেল, ডাল ও মসলা আমদানির ওপর দেশকে নির্ভর করতে হয়। দুধ, মাংস, ডিম ও মাছের একক মূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। দেশের প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষের পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাদ্যে প্রবেশাধিকার নেই।
জলবায়ুগত দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ ও অরক্ষিত দেশ। বৈশ্বিক কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনে বাংলাদেশের অবদান মাত্র ০ দশমিক ৫ শতাংশ হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি বহন করতে হচ্ছে এ দেশকেই। ২০২৬ সালের এপ্রিলের শেষভাগ ও মে মাসের শুরুতে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকায় আকস্মিক বন্যায় হাজারো হেক্টর বোরো ধানখেত তলিয়ে গেছে, যা ফসল কাটার মৌসুমে মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়েছে।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শুধু নেত্রকোণাতেই ১৩ হাজার হেক্টরের বেশি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জেও হাজারো হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষকেরা ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। অনেকেই জানিয়েছেন, তাদের বার্ষিক আয়ের একমাত্র উৎস বোরো ফসল কাটার ঠিক আগে পানিতে তলিয়ে গেছে।
২০২৬ সালের ২ মে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে এক কৃষক তার ছয় বিঘা বোরো ধান বন্যার পানিতে তলিয়ে যেতে দেখে মৃত্যুবরণ করেন। জ্বালানি, সার, কীটনাশক ও শ্রমের মতো উপকরণের ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের কৃষি খাত বর্তমানে গুরুতর সংকটের মুখে রয়েছে। অন্যদিকে, খামার পর্যায়ে ফসলের বাজারদর কমে যাওয়ায় কৃষকের লাভজনকতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বোরো ধানের মতো প্রধান ফসলের উৎপাদন ব্যয় প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। অনেক কৃষক সেচের পানিসহ প্রয়োজনীয় উপকরণের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারছেন না। এর ফলে কৃষি খামারের মুনাফা এবং কৃষকের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে।
সুনামগঞ্জের কৃষক আলী আকবর বলেন, ‘ফসল উৎপাদন করে আমাদের কোনো লাভ হচ্ছে না। কৃষিকাজে কঠোর পরিশ্রম করেও কোনো রকমে টিকে আছি।’ (প্রথম আলো, ২৫ এপ্রিল ২০২৬)
উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ফসলের কম বাজারদর অনেক কৃষককে ঋণের চক্রে ফেলে দিয়েছে এবং তাদের অনেককে কৃষিকাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য করছে। এমনকি কিছু কৃষকের আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে।
আমাদের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি, যা দরিদ্র ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জন্য চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি করে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো খাদ্য মূল্যস্ফীতির উচ্চ হার, যা দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ, যা ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ১৪ দশমিক ১০ শতাংশ থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নতির কারণে এই হ্রাস সম্ভব হয়েছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমানোর প্রধান শর্ত হলো কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি। সাম্প্রতিক সময়ে কৃষি উৎপাদন বাড়লেও এর প্রবৃদ্ধির হার অত্যন্ত ধীরগতিতে এগোচ্ছে। বর্তমানে কৃষি খাতের প্রকৃত প্রবৃদ্ধি খুবই কম।
২০০৯-১০ অর্থবছরে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কমে প্রায় ২ দশমিক ৪২ শতাংশে নেমে এসেছে।
এমনকি আগের বছরের ৩ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির তুলনায়ও এটি একটি নিম্নগতি নির্দেশ করে। দেশের প্রায় ৪৫ শতাংশ শ্রমশক্তি কৃষি খাতে নিয়োজিত থাকলেও তুলনামূলক কম বাজেট বরাদ্দের কারণে এ খাত নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
জাতীয় বাজেট ও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) কৃষি খাতের অংশীদারত্ব সাধারণভাবে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখিয়েছে। কৃষি ভর্তুকি মূলত সার, সেচের বিদ্যুৎ এবং কৃষিযন্ত্রের ওপর কেন্দ্রীভূত।
ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে সার ও কৃষিযন্ত্র আমদানি ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে, ফলে কৃষি খাতে আরও বেশি ভর্তুকির প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
সাম্প্রতিক বাজেট ও ভর্তুকি বরাদ্দ স্থবির রয়েছে এবং কৃষি প্রবৃদ্ধিকে প্রয়োজনীয় মাত্রায় উন্নীত করা ও খাদ্যনিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য তা যথেষ্ট নয়।
২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষি উৎপাদনের প্রবৃদ্ধির হার ৪ থেকে ৫ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। এর জন্য কৃষিতে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন, কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না।
২০১১-১২ অর্থবছরের মূল বাজেটের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটের আকার ৪ দশমিক ৭৮ গুণ বেড়েছে। বিপরীতে কৃষি বাজেট বেড়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৭৮ গুণ।
২০১১-১২ অর্থবছরে মোট বাজেটের মধ্যে কৃষি বাজেটের অংশ ছিল ১০ দশমিক ৬৫ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে ৫ দশমিক ৯৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একইভাবে কৃষি ভর্তুকির অংশও ৬ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ২ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ, সামগ্রিক বাজেট বৃদ্ধির তুলনায় কৃষি বাজেট ও ভর্তুকি আনুপাতিক হারে বাড়েনি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট বাজেটের পাশাপাশি কৃষি বাজেট ও ভর্তুকির পরিমাণও কমানো হয়েছে।
গত ১৬ বছরে কৃষিঋণের পরিমাণ তিন গুণেরও বেশি বেড়েছে এবং এর গড় বার্ষিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ৮ শতাংশ। তবে এখনও এটি মাত্র ২২ শতাংশ কৃষককে অন্তর্ভুক্ত করতে পেরেছে। মোট প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের মধ্যে কৃষিঋণের অংশ মাত্র প্রায় ২ শতাংশ।
আমদানি-প্রতিস্থাপনকারী ফসল (ডাল, তৈলবীজ, ভুট্টা ও মসলা) উৎপাদনের জন্য ৪ শতাংশ সুদে ঋণের ব্যবস্থা থাকলেও কৃষকেরা অভিযোগ করেন, স্থানীয় ব্যাংক শাখাগুলো প্রকৃত প্রয়োজনীয় কৃষকদের এই ঋণ দিতে অনাগ্রহী।
কৃষিঋণ পরিশোধের হার অত্যন্ত সন্তোষজনক, যা অন্যান্য খাতের তুলনায় অনেক ভালো। অনেক সময় ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বিতরণের পরিমাণকেও ছাড়িয়ে যায়। এটি প্রমাণ করে যে কৃষকেরা ঋণ পরিশোধের ব্যাপক চাপের মধ্যে থাকেন এবং কখনো কখনো চরম হতাশাগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যার পথও বেছে নেন।
উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যায় বোরো ধানের ক্ষতি এবং বহিরাগত ধাক্কার কারণে বাংলাদেশ বর্তমানে গুরুতর খাদ্যনিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে বাংলাদেশের কৃষি খাতের জন্য খাদ্যনিরাপত্তা, আধুনিকায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজনকে কেন্দ্র করে উচ্চ অগ্রাধিকারভিত্তিক সহায়তা অব্যাহত রাখার প্রয়োজন রয়েছে।
বৃহত্তর কৃষি খাতের জন্য মোট ৯৪ হাজার কোটি টাকা (মোট বাজেটের ১০ শতাংশ) বরাদ্দ রেখে বাজেট প্রণয়ন করা উচিত। এর মধ্যে ৪০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি হিসেবে (কৃষি উৎপাদনের মূল্যের ১০ শতাংশ) বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন। আগামী বাজেটে কৃষকদের সহায়তার জন্য লক্ষ্যভিত্তিক কর কমানো, শুল্ক অব্যাহতি এবং অন্যান্য সহায়ক পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
টেকসই কৃষি প্রবৃদ্ধি এবং উন্নত খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যান্ত্রিকীকরণ, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, উৎপাদন বৈচিত্র্য, সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা, জ্বালানি নিরাপত্তা, মূল্যশৃঙ্খল উন্নয়ন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আরও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ প্রয়োজন।
উৎপাদন ব্যয় পর্যবেক্ষণ, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য অস্থিরতার মাত্রা মূল্যায়ন, কৃষিপণ্যের কর ও শুল্কহার নির্ধারণ এবং কৃষকদের জন্য সহায়ক মূল্য সুপারিশের লক্ষ্যে একটি স্বাধীন কৃষি মূল্য কমিশন গঠন করা উচিত।
ড. জাহাঙ্গীর আলম: কৃষি অর্থনীতিবিদ

