সবার জন্য উন্মুক্ত করার কয়েক দিনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র সরকারের উদ্বেগের মুখে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দুটি মডেলের ব্যবহার স্থগিত করেছে প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক।
নিজেদের ওয়েবসাইটে দেওয়া এক বিবৃতিতে অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, বিদেশি নাগরিকদের ‘ক্লদ ফেবল ৫’ ব্যবহার থেকে বিরত রাখতে তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রোগ্রামটিকে কোম্পানিটি নিজেই ‘অত্যধিক শক্তিশালী’ বলে দাবি করেছিল।
বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, ‘এই নির্দেশের কারণে নিয়ম মেনে বাধ্য হয়ে আমাদের সব গ্রাহকের জন্য ফেবল ৫ ও মিথোস ৫-এর কার্যক্রম হঠাৎ করে বন্ধ করে দিতে হচ্ছে।’
‘ক্লদ ফেবল ৫’ হলো অ্যানথ্রপিকের ‘ক্লদ মিথোস’-এর একটি সংস্করণ। অ্যানথ্রপিক বলছে, এই মডেলের ব্যবহার বন্ধের পেছনে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ সুনির্দিষ্ট কোনো উদ্বেগের কথা জানায়নি।
প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, ‘আমাদের ধারণা, সরকার মনে করছে তারা ফেবল ৫-এর নিরাপত্তাব্যবস্থা এড়ানো বা “জেলব্রেক” করার কোনো পদ্ধতির কথা জেনেছে।’
কোনো সাইবার নেটওয়ার্ককে সুরক্ষিত রাখতে যেসব সফটওয়্যারের নিরাপত্তাব্যবস্থা ভাঙার প্রক্রিয়া হলো জেলব্রেকিং। এর মাধ্যমে হ্যাকাররা সংবেদনশীল তথ্য হাতিয়ে নিতে পারেন বা বিভিন্ন উপায়ে মানুষের ক্ষতি করতে পারেন।
অ্যানথ্রপিক বলছে, ‘সফটওয়্যারের দুর্বলতা খুঁজে বের করতে এআই মডেলটি যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে তার একটি নমুনা (ডেমো) আমরা পর্যালোচনা করেছি।’
ক্লদ ফেবল ৫ উন্মুক্ত করার আগে প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছিল, সাইবার হ্যাকিং রোধে এতে বিভিন্ন ধরনের ‘সুরক্ষাব্যবস্থা’ যুক্ত করা হয়েছে।
সিস্টেমের ভেতরের দুর্বলতা যাচাই-বাছাইয়ের জন্য গত এপ্রিলে এটি সীমিত পরিসরে উন্মুক্ত করা হয়েছিল। এটি সবার জন্য উন্মুক্ত করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি নীতিনির্ধারকেরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
অ্যানথ্রপিক জানায়, ব্যবহারকারীদের জন্য উন্মুক্ত করার আগে হাতে গোনা কয়েকটি সংস্থাকে এটি ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কারণ এআই টুলটি এতটাই ‘বুদ্ধিমান’ যে কম্পিউটার সিস্টেম হ্যাক করার ক্ষমতার কারণে এটি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে বলে তাদের নিজেদের আশঙ্কা ছিল।
যদিও অনেক সমালোচক একে অতিরঞ্জিত প্রচার ও বিপণন কৌশল বলে তখন প্রশ্ন তুলেছেন।
প্রতিষ্ঠানটি বলছে, ‘আমাদের আগের যেকোনো এআই মডেলের চেয়ে ফেবলের সক্ষমতা অনেক বেশি।’
কয়েক সপ্তাহের আলোচনার পর গত জুনের শুরুতে ‘মিথোস’ ব্যবহারের সুযোগ পায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। এ প্রসঙ্গে ইইউ বলেছে, এটি প্রমাণ করে যে ইউরোপের নিজস্ব ‘প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্ব’ থাকাটা কতটা জরুরি।
ইউরোপীয় কমিশনের মুখপাত্র থমাস রেগনিয়ার বলেন, ‘আমরা অ্যানথ্রপিকের বিবৃতি আমলে নিয়েছি এবং বিষয়টি মূল্যায়ন করছি।’ এআইসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির জন্য আমেরিকা ও এশিয়ার ওপর ২৭ দেশের এই জোটের নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে চলতি মাসেই নতুন উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে কমিশন।
লন্ডনের কুইন মেরি ইউনিভার্সিটির রেসপনসিবল এআই বিষয়ের অধ্যাপক জিনা নেফ বিবিসিকে বলেন, মডেলটির ব্যবহার সীমিত করার এই সিদ্ধান্ত এ ধরনের এআই সিস্টেমের বিকাশ ও পরীক্ষাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এর ফলে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার পথও সংকুচিত হতে পারে।
অধ্যাপক জিনা নেফ বলেন, ‘আমরা এই মুহূর্তে সম্পূর্ণ এক অজানা পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছি।’
‘এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তাব্যক্তিরা আমাদের এই বলে সতর্ক করে আসছেন যে এই টুলগুলো খুব দ্রুত উন্নত হচ্ছে। সাইবার আক্রমণ থেকে নিজেদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুরক্ষিত রাখার সক্ষমতা আমাদের অর্জন করতে হবে।’
জিনা নেফ জানান, যুক্তরাজ্য সরকারের এআই সিকিউরিটি ইনস্টিটিউট তাদের এক পরীক্ষায় দেখেছে, এই মডেলটি ৭৩ শতাংশ ক্ষেত্রেই নিরাপত্তাব্যবস্থা ও সিস্টেম হ্যাক করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ‘সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এটি বড় একটি পরিবর্তন।’
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের তোপের মুখে পড়ে অ্যানথ্রপিক।
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে প্রতিষ্ঠানটির সমালোচনা করেছেন। এরপর মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ প্রতিষ্ঠানটিকে ‘সাপ্লাই চেইন রিস্ক’ বা সরবরাহব্যবস্থার জন্য ঝুঁকি বলে আখ্যা দেন।
এর আগে চীনের হুয়াওয়ে সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র সরকার এমন কথা বলেছিল। এবার তারা নিজেদের দেশের একটি প্রতিষ্ঠানকেই তাদের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করছে।
এই আখ্যা পাওয়ার পর পেন্টাগনের বিরুদ্ধে মামলা করে অ্যানথ্রপিক। তবে বিচারক রায় দিয়েছেন, পেন্টাগনের ওই নির্দেশ এখনই কার্যকর করা যাবে না। এর অর্থ হলো, আইনি লড়াই চলাকালে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কাজ করা সরকারি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলো চাইলে এখনো অ্যানথ্রপিকের প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারবে।

