দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম এখন চাষিদের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উৎপাদন ভালো হলেও বাজারে ন্যায্যমূল্য না পাওয়া এবং সংরক্ষিত পেঁয়াজে ব্যাপক পচন ধরায় দেশের প্রধান উৎপাদনকারী অঞ্চলের কৃষকেরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন।
রাজবাড়ী, ফরিদপুর, পাবনা ও কুষ্টিয়ার মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে, এবার পেঁয়াজের বাম্পার ফলন হলেও কৃষকের ঘরে স্বস্তি ফেরেনি। বরং উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সংরক্ষণ সমস্যাজনিত পচন, ওজন কমে যাওয়া এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে মোট পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে ৩১ লাখ ৪০ হাজার ৬৯০ মেট্রিক টন। আগের অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ২৯ লাখ ৯০ হাজার ৮৪২ মেট্রিক টন। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে উৎপাদন বেড়েছে প্রায় দেড় লাখ মেট্রিক টনের বেশি।
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, অনুকূল আবহাওয়া, চাষের বিস্তার এবং হাইব্রিড জাতের ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন বেড়েছে। কিন্তু বাজারে সেই বাড়তি উৎপাদনই এখন কৃষকের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পাবনার সুজানগর উপজেলার দুর্গাপুর গ্রামের পেঁয়াজ চাষি মো. কামারুজ্জামান জানান, গত কয়েক বছরের মধ্যে এবারই পেঁয়াজের দাম সবচেয়ে কম।
তিনি জানান, নিজের জমিতে প্রতি কেজি পেঁয়াজ উৎপাদনে তার খরচ হয়েছে ২৮ থেকে ৩০ টাকা। আর লিজ নেওয়া জমিতে সেই খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮ থেকে ৪০ টাকা। অথচ বর্তমানে বাজারে সর্বোচ্চ ২৫ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ বিক্রি করতে হচ্ছে।
তার ভাষায়, ‘চাষ করে যা খরচ হয়েছে, এখন বিক্রি করে তার অর্ধেকও উঠছে না।’
রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার চাষি বিশ্বজিৎ বিশ্বাসের অভিজ্ঞতা আরও হতাশাজনক। তিনি প্রায় ৪ লাখ ৭০ হাজার টাকা ব্যয়ে সাড়ে চার একর জমিতে হাইব্রিড জাতের পেঁয়াজ আবাদ করেছিলেন। ফলনও হয়েছিল ভালো—মোট ৬০০ মণ। কিন্তু ভালো দামের আশায় সংরক্ষণাগারে রাখা ৪৫০ মণ পেঁয়াজের প্রায় ৯০ শতাংশই পচে গেছে। এখন অবশিষ্ট পেঁয়াজ বিক্রি করেও এক লাখ টাকা পাওয়া যাবে না বলে জানান তিনি।
তার কথায়, ‘যে পেঁয়াজ ধরে রেখে লাভের আশা করেছিলাম, সেই পেঁয়াজই এখন আমাদের সর্বনাশ করল।’
একই উপজেলার আরেক চাষি বাশার মোল্লা বলেন, কোরবানির ঈদের আগে ভালো দাম পাওয়ার আশায় তিনি পেঁয়াজ সংরক্ষণ করেছিলেন। সেই টাকায় পরিবার নিয়ে ভালোভাবে ঈদ করবেন বলেও ভেবেছিলেন। কিন্তু বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে উৎপাদন খরচই উঠছে না।
হতাশ কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘এ বছর পেঁয়াজ চাষিদের আর ঈদ বলে কিছু নেই।’
রাজবাড়ী সদর উপজেলার ইন্দনারায়ণপুর গ্রামের চাষি মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, উৎপাদন ভালো হওয়ায় তিনি আশা করেছিলেন পেঁয়াজ বিক্রি করে কোরবানির জন্য একটি গরু কিনবেন। কিন্তু এখন ১০০ মণ পেঁয়াজ বিক্রি করেও একটি মাঝারি গরু কেনা সম্ভব নয়।
তার কথায়, ‘যে ফসল নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিলাম, সেটাই এখন দুঃস্বপ্ন।’
ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার বাস্তপুটি গ্রামের কৃষক লক্ষ্মণ মণ্ডল জানান, প্রতি বছর লাভের আশায় তারা পেঁয়াজ সংরক্ষণ করেন। কিন্তু এবার দাম এতটাই কম যে লাভ তো দূরের কথা, উৎপাদন খরচও উঠবে না।
তিনি আরও জানান, সংরক্ষণের সময় পেঁয়াজ শুকিয়ে ওজন কমে যায়, আবার পচন ধরলে পুরো মজুত নষ্ট হয়ে যায়। এতে দ্বিগুণ ক্ষতির মুখে পড়ছেন কৃষকেরা।
শুধু কৃষকেরাই নন, ক্ষতির মুখে রয়েছেন ব্যবসায়ীরাও। রাজবাড়ীর বানিবহ বাজারের ব্যবসায়ী মো. ইসলাম খান বলেন, বর্তমানে বাজারে ভালো মানের পেঁয়াজ সর্বোচ্চ ১ হাজার ৫০ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে। গত বছর একই সময়ে দাম ছিল ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা।
তার মতে, বাজারে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি থাকায় দাম পড়ে গেছে। তিনি আরও জানান, অনেক কৃষক পচন ধরা পেঁয়াজ দ্রুত বিক্রি করে দিচ্ছেন, ফলে বাজারে সরবরাহ আরও বেড়ে যাচ্ছে।
একই বাজারের আরেক ব্যবসায়ী সেলিম মোল্লা বলেন, তিনি রাজবাড়ী থেকে পেঁয়াজ কিনে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে পাঠান। কিন্তু কোরবানির পশু পরিবহনের কারণে ট্রাকের সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে পরিবহন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে।
তিনি বলেন, ‘১ হাজার টাকা মণ দরে পেঁয়াজ কিনলেও পরিবহন খরচ যোগ করে চট্টগ্রামে নিতে ১ হাজার ৫০ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা পড়ে যায়।’ এর সঙ্গে পচা পেঁয়াজ আলাদা করতে অতিরিক্ত শ্রমিক খরচও যুক্ত হচ্ছে। ফলে ব্যবসায়ীরাও মুনাফা করতে পারছেন না।
ফরিদপুর কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ বাজার কর্মকর্তা শাহাদাৎ হোসেন জানান, বর্তমানে মানভেদে প্রতি মণ পেঁয়াজ ৭০০ থেকে ১ হাজার ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত বছর একই সময়ে এ দাম ছিল প্রায় দ্বিগুণ। তার মতে, উৎপাদন বেশি হওয়াই বাজারদর কমে যাওয়ার প্রধান কারণ।
তবে শুধু উৎপাদন বৃদ্ধিই নয়, এবারের বড় সংকট হলো পচন। ফরিদপুর মসলা গবেষণা উপকেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. মুশফিকুর রহমান বলেন, হারভেস্টিংয়ের সময় কয়েক দিনের বৃষ্টির কারণে এ বছর পেঁয়াজে বেশি পচন ধরেছে। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, সাধারণ পেঁয়াজে যেখানে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পানি থাকে, সেখানে হাইব্রিড পেঁয়াজে পানির পরিমাণ আরও বেশি। ফলে সংরক্ষণে এগুলো দ্রুত নষ্ট হয়।
তিনি আরও বলেন, ‘বেশি ফলনের আশায় কৃষকেরা হাইব্রিড জাতের দিকে ঝুঁকেছেন। কিন্তু সব হাইব্রিড জাত দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য নয়।’
তার মতে, অনেক কৃষক নিজেরা বীজ উৎপাদন করায় বিভিন্ন জাত মিশে যাচ্ছে। এতে কোন পেঁয়াজ দীর্ঘদিন রাখা যাবে আর কোনটি যাবে না—তা কৃষকেরা বুঝতে পারছেন না। ফলে ভুলভাবে সংরক্ষণ করে ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
তিনি জানান, বর্তমানে প্রতি কেজি পেঁয়াজ উৎপাদনে কৃষকের খরচ ২৮ থেকে ৩০ টাকা। বাজারদর যদি এর নিচে থাকে, তাহলে কৃষকের ক্ষতি হওয়াই স্বাভাবিক।
ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. শাহাদুজ্জামান বলেন, এ বছর সারা দেশে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। তাই বাজারে দাম কম। তিনি কৃষকদের এখনই পেঁয়াজ বিক্রি না করে আরও কিছুদিন সংরক্ষণ করার পরামর্শ দেন। তার আশা, আগামী এক মাসের মধ্যে বাজারে দাম বাড়তে পারে।
অন্যদিকে রাজবাড়ী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. শহিদুল ইসলাম জানান, বৃষ্টি ও নিম্নমানের বীজের কারণে জেলায় উৎপাদিত মোট পেঁয়াজের প্রায় ৫ শতাংশ নষ্ট হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘দেশে কৃষকের কাছে পেঁয়াজ থাকা অবস্থায় যাতে আমদানি না করা হয়, সে বিষয়ে আমরা কৃষি মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি।’ একইসঙ্গে তিনি বাজারে কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় প্রতি কেজি পেঁয়াজের ন্যূনতম মূল্য ৪০ টাকা নির্ধারণের ব্যবস্থার কথাও উল্লেখ করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের কৃষি অর্থনীতিতে পেঁয়াজ একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল। কিন্তু উৎপাদন বাড়লেও যদি কৃষক ন্যায্যমূল্য না পান, তাহলে ভবিষ্যতে তারা এই চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন। একইসঙ্গে সংরক্ষণব্যবস্থা আধুনিক না হলে প্রতি বছরই একই সংকট ফিরে আসবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কৃষকের প্রধান দাবি—পেঁয়াজ আমদানি নিয়ন্ত্রণ, ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নির্ধারণ এবং আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলা। নইলে উৎপাদন বাড়লেও কৃষকের ভাগ্য বদলাবে না। বরং বাম্পার ফলনই হয়ে উঠবে লোকসানের আরেক নাম।

