Friday, February 6, 2026

পরাজয় মেনে নেওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে প্রতিটি রাজনীতিবিদের

Share

আসন্ন নির্বাচনকে বিশেষ করে তুলেছে তিনটি বিষয়। সেগুলো হলো: জামায়াতে ইসলামীর পুনরুত্থান, বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতিতে কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে তারেক রহমানের উত্থান এবং নির্বাচন থেকে আওয়ামী লীগের কার্যত ছিটকে পড়া—যা ২০২৪ সালের আগস্টের আগে ছিল কল্পনাতীত।

জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের জন্মের বিরোধিতা করেছিল, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে গণহত্যায় সহায়তা করেছিল এবং আল-বদর ও আল-শামসের মাধ্যমে আমাদের বুদ্ধিজীবী হত্যায় যুক্ত ছিল। সবমিলিয়ে মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকার কারণে সবসময়ই বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাদের উপস্থিতি গভীরভাবে বিতর্কিত।

মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকার জন্য বাংলাদেশের মানুষের কাছে ক্ষমা না চাওয়ায় তাদের গ্রহণ করা প্রায় অসম্ভব করে তুলেছে। দলটির সর্বশেষ অবস্থান হচ্ছে, তাদের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘সাতচল্লিশ থেকে শুরু করে ২০২৫ সালের আজ ২২ অক্টোবর রাত ৮টা ১১ মিনিট পর্যন্ত আমাদের দ্বারা যে যেখানে যত কষ্ট পেয়েছেন, আমরা বিনা শর্তে তাদের কাছে মাফ চাই। এটা গোটা জাতি হলেও চাই, ব্যক্তি হলেও চাই। কোনো অসুবিধা নাই।’ ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের জন্ম হয় এবং এর বিরোধিতা করেছিলেন দলটির প্রতিষ্ঠাতা আবুল আলা মওদুদীর নেতৃত্বাধীন জামায়াতে ইসলামী। কিন্তু ১৯৭১ সালের ঘটনাবলির প্রসঙ্গ টেনে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধিতা এবং সাধারণ ও স্বাধীনতাপ্রেমী মানুষের বিরুদ্ধে অবস্থানের জন্য ক্ষমা না চাওয়ার যে অনড় অবস্থান, সেটিই সবচেয়ে বেদনাদায়ক।

এমন অতীত নিয়েও আসন্ন নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী হয়ে উঠেছে এক গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। জনমত জরিপগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, আগামী সংসদে তারা দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। এমন লজ্জাজনক অতীত নিয়েও কীভাবে তারা এতটা শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছাল?

এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মাঝে মুসলিম পরিচয়ের চেতনা আরও বলিষ্ঠভাবে উন্মেষ হচ্ছে এবং সেই পরিচয়ের সবচেয়ে খাঁটি প্রতিনিধি হিসেবে জামায়াতে ইসলামী নিজেদের তুলে ধরার চেষ্টা করছে। মধ্যপন্থী দুই দল—মূলত আওয়ামী লীগ এবং কিছুটা বিএনপি—ভোটারদের মনে জাতীয়তাবাদী ও ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির গভীর ও স্থায়ী প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হওয়াই জামায়াতের পুনরুত্থানের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। দেশ গণতন্ত্রের পথে আসার পর ১৯৯১ সাল থেকে এই দুই দলই ক্ষমতায় ছিল। কিন্তু, এই দুই দলের শাসন মানুষকে তাদের কাছ থেকে আরও দূরে সরিয়ে দিয়েছে। গত ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগের দুর্নীতিগ্রস্ত, শোষণমূলক ও দমনমূলক ভূমিকা বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতের শক্ত অবস্থান তৈরির আরও বড় সুযোগ করে দিয়েছে।

ধর্ম ব্যবহারে ধারাবাহিক আদর্শিক অবস্থান, সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং তৃণমূল কর্মীদের অবদান জামায়াতের বর্তমান শক্তি অর্জনে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। বছরের পর বছর ছাত্রলীগের অংশ হয়ে থাকা এবং অনেক ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠনটির দ্বিতীয় সারির নেতৃত্বের ভূমিকায় চলে যাওয়ার যে কৌশল তারা নিয়েছে, তা দলটির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সাংগঠনিক দক্ষতার কার্যকারিতাই প্রমাণ করে। সম্প্রতি দেশের পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবিরের যে বিজয়, তা তাদের সামগ্রিক প্রচেষ্টার সাফল্যেরই প্রমাণ। এটাও জানা যাচ্ছে, তৃণমূলে জামায়াতের নারী কর্মীরা ঘরে ঘরে গিয়ে প্রচারণায় অত্যন্ত সক্রিয় ও কার্যকর ভূমিকা রাখছেন।

একইসঙ্গে জামায়াতের নির্বাচনী মিত্র জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কথাও উল্লেখ করতে হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থান থেকে উদ্ভূত এই দলটি বিশাল প্রত্যাশা নিয়ে নির্বাচনী রাজনীতিতে এসেছিল। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত তাদের নিকট ও সুদূর ভবিষ্যতে প্রভাব ফেলতে পারে।

এই নির্বাচনের দ্বিতীয় অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো তারেক রহমানের উত্থান। শুরু থেকেই তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের উত্তরাধিকারী হিসেবে বিবেচিত ছিলেন। কিন্তু, তারপরও তার উত্থান সত্যিই বিস্ময়কর। তিনি দীর্ঘ সময় লন্ডনে অবস্থান করেছেন; মা কারাবন্দি থাকার সময়টায় দলকে সচল রেখেছেন আধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহার করে। তার এই প্রচেষ্টা একটি রাজনৈতিক দলের প্রেরণা ও শৃঙ্খলা ধরে রাখার সক্ষমতার প্রমাণ দেয়।

মোবাইল ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে তৃণমূল নেতৃত্বের সঙ্গে তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের তরুণ বিএনপি কর্মীদের কাছে ছিল গর্বের বিষয়। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দলটি ভাঙার বা গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের নিজেদের দিকে টানার বহু চেষ্টা নস্যাৎ হয়ে গেছে তারেক রহমানের সরাসরি যোগাযোগ ও প্রভাবক ক্ষমতার কারণে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশের রাজনীতিতে ১৫ বছরের প্রত্যক্ষ অনুপস্থিতি অনেক বড় বিষয়। সেইসঙ্গে এই সময়কালে আওয়ামী লীগ সরকারের লাগাতার দমন-পীড়নের মধ্যেও বিএনপিকে মোটামুটি অক্ষুণ্ণ রাখা তারেক রহমানের সাংগঠনিক দক্ষতার সাক্ষ্য দেয়।

অনেকে মনে করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও বাংলাদেশে ফিরতে তারেক রহমান অনেক বেশি দেরি করেছেন। তিনি যদি আরও আগে ফিরতেন, বিএনপি আরও বেশি শক্তিশালী হতো। কিন্তু, দেরিতে ফিরলেও তার প্রত্যাবর্তন দলকে গতি দিয়েছে, কর্মীদের উজ্জীবিত করেছে এবং আত্মবিশ্বাসের যে ঘাটতি ছিল, তা পূরণ করেছে। জনগণের উষ্ণ আমন্ত্রণ ও তার প্রতিটি জনসমাবেশে বিশাল জনসমাগমের মাধ্যমে প্রকাশ পাওয়া সমর্থন তাকে বাংলাদেশের বর্তমান নির্বাচনী রাজনীতির এক কেন্দ্রীয় চরিত্রে পরিণত করেছে।

এখন পর্যন্ত তারেক রহমান নিজের পরিমিতিবোধের পরিচয় দিয়ে যাচ্ছেন। তার বক্তৃতাগুলো সংযত ও ভবিষ্যতমুখী। এত এত বাগাড়ম্বরপূর্ণ বক্তৃতার ভিড়ে তারেক রহমান বলে যাচ্ছেন ক্ষমতায় এলে কী করতে চান। এখানেই অন্যদের সঙ্গে নিজের পার্থক্য স্পষ্ট করেছেন তিনি। দলকে নির্বাচনী প্রচারণার জন্য কতটা কার্যকরভাবে সংগঠিত করতে পেরেছেন তিনি, তা ভোটের পর স্পষ্ট হবে। তবে এখন পর্যন্ত তিনি তার প্রয়াত মায়ের জায়গা সফলভাবে পূরণ করেছেন। তার মা বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি জনগণের ভালোবাসা ও সম্মানের সবচেয়ে বড় প্রমাণ দেখা গেছে তার জানাজায়। মানুষের সেই সহানুভূতি উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়ার সম্ভাবনাও তারেক রহমানের রয়েছে।

আসন্ন নির্বাচনের তৃতীয় বৈশিষ্ট্য হলো আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ না থাকা। দলটি নিষিদ্ধ হয়নি, তবে তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ। বাংলাদেশের স্বাধীনতায় এত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এবং গত ৫৫ বছর ধরে দেশের রাজনীতির অন্যতম অংশ থাকা দলটি কীভাবে নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে ছিটকে পড়ার মতো দুর্বল হলো?

আওয়ামী লীগের এই বিপর্যয়ের পেছনে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমসহ নানা কারণ রয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় কারণ হলো তাদের শাসনামলের শেষ ছয় সপ্তাহে ঢাকাসহ সারা দেশে চালানো নির্মম হত্যাকাণ্ড। আবু সাঈদের ঘটনাটিই ধরুন না। অন্য আন্দোলনকারীদের থেকে দূরে একা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা সম্পূর্ণ নিরস্ত্র এক তরুণ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে গুলি করে হত্যা করা হলো। অথচ, সে অন্য কারো জন্য তো নয়ই, পুলিশের জন্যও কোনো হুমকি সৃষ্টি করেনি। পুরো জাতি সেই ঘটনা দেখেছে।

শেখ হাসিনা ও তার সরকার নিষ্ঠুর নিপীড়কের মানসিকতা দেখিয়েছে এবং জনগণ, বিশ্বাসযোগ্যতা, গ্রহণযোগ্যতা সবই হারিয়েছে। বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়, যখন দুঃখ প্রকাশ করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে হাসিনা সরকার একাধিকবার ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে কারসাজি করে এবং ক্ষমা চাওয়ার পরিবর্তে হত্যাকে যুক্তিযুক্ত প্রমাণের চেষ্টা করে। এরপর কয়েক সপ্তাহ ধরে বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হয়। এরই প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার পরিস্থিতি তৈরি হয়। আওয়ামী লীগের ভোটাররা কোন দলের দিকে ঝুঁকবেন, সেটা সম্ভবত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলবে।

এই নির্বাচনের আরেকটি বাড়তি বৈশিষ্ট্য হলো জাতীয় পার্টির ম্লান হয়ে যাওয়া। জেনারেল এরশাদের শাসনামলে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত রাজনীতিতে প্রাধান্য বিস্তার করেছিল দলটি। এরপর প্রতিটি নির্বাচনে অন্তত তৃতীয় অবস্থান ধরে রেখেছিল।

একটি দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার কেন্দ্রবিন্দু নির্বাচন। তবে আমাদের আসন্ন নির্বাচনটি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বাংলাদেশে জরুরি ভিত্তিতে স্থিতিশীলতা, মবতন্ত্রের অবসান, প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। আর এর সবই হতে হবে নির্বাচিত সংসদ, জবাবদিহিমূলক সরকার, দক্ষ নীতিনির্ধারক এবং আমরা কোন পথে এগোচ্ছি—সে বিষয়ে স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে।

শেষ করতে চাই সতর্কবার্তা দিয়ে। ইতিহাস বলে, আমরা নির্বাচনের বিষয়ে অত্যন্ত উৎসাহী হলেও পরাজয় মেনে নিতে ভীষণ অনিচ্ছুক। পরাজিতদের দুটি শ্রেণি—প্রার্থীর পরাজয় এবং সরকার গঠনের জন্য পর্যাপ্ত আসন না পেয়ে দলীয় পরাজয়। সাধারণত দল সরকার গঠন করতে না পারলেই পুরো নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়াকে অস্থিতিশীল করে তোলা হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেও সব নির্বাচনে আমরা এমনটিই দেখেছি। আমরা আগেও লিখেছিলাম, ‘আমরা জিতলে নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু, আর হারলে কারচুপি’—এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

আমাদের আন্তরিক প্রত্যাশা, ফলাফল যাই হোক মর্যাদা ও সৌজন্যের সঙ্গে তা যেন গ্রহণ করা হয়। তথ্যভিত্তিক সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ থাকলে নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী সেগুলো উত্থাপন করুন। অযথা বিশৃঙ্খলা ও বিঘ্ন সৃষ্টি করবেন না। দেশকে দ্রুত ও শান্তিপূর্ণভাবে এগিয়ে নিতে দিন।

আমরা রইলাম অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের প্রত্যাশায়।

মাহফুজ আনাম, সম্পাদক ও প্রকাশক, দ্য ডেইলি স্টার

ইংরেজি থেকে অনূদিত

Read more

Local News