বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ রূপকল্পের আওতায় সরকারি ও আর্থিক খাতের বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার ব্যবসা করেছে ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান লিডস করপোরেশন লিমিটেড। সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার প্রযুক্তি অবকাঠামো ও সফটওয়্যার সেবায় প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘদিনের কার্যক্রম থাকলেও একপর্যায়ে আর্থিক সংকট, কর্মীদের বেতন বকেয়া এবং মালিকানা-সংক্রান্ত পুরোনো আইনি বিরোধের কারণে প্রতিষ্ঠানটি সংকটে পড়ে। এমনকি আদালতের আদেশে নিলামের প্রক্রিয়ায় যায় লিডসের কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার ব্যাংকআল্টিমাস।
সংশ্লিষ্ট খাতের তথ্য ও আর্থিক নথি বিশ্লেষণ করে জানা যায়, গত দেড় দশকে লিডস করপোরেশনের সম্পাদিত কাজের আর্থিক পরিমাণ আনুমানিক ১ হাজার ২০০ কোটি থেকে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। এর বড় অংশ এসেছে ডেল ও এনসিআরের স্থানীয় অংশীদার হিসেবে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংকে কয়েক হাজার এটিএম বুথ স্থাপন এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাস্টমস ও নির্বাচন কমিশনের মতো সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ তথ্যকেন্দ্রে যন্ত্রপাতি সরবরাহ থেকে। এসব কাজের আর্থিক পরিমাণ প্রায় ৬০০ কোটি থেকে ৮৫০ কোটি টাকা।
লিডসের নিজস্ব কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার ব্যাংকআল্টিমাস এবং ব্রোকারেজ ব্যাক অফিস সফটওয়্যার ব্লুচিপের লাইসেন্স ও বাস্তবায়ন থেকেও প্রতিষ্ঠানটি আয় করেছে। এ খাত থেকে আয় হয়েছে আনুমানিক ২০০ কোটি থেকে ৩০০ কোটি টাকা। পাশাপাশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি এবং কারিগরি সহায়তার মাধ্যমে প্রতি মাসে প্রায় ৪ কোটি থেকে ৭ কোটি টাকা আয় হতো বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। গত ১৫ বছরে এ খাত থেকে আয় হয়েছে আনুমানিক ৩০০ কোটি থেকে ৪৫০ কোটি টাকা।
এ ছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাস্টমস আধুনিকায়ন, নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভান্ডার অবকাঠামো, জাতীয় ই-সেবা বাস এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ প্রকল্প থেকেও লিডসের আয় ছিল। এসব প্রকল্প থেকে প্রতিষ্ঠানটির আয় আনুমানিক ১০০ কোটি থেকে ১৫০ কোটি টাকা বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়।
বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি সেবায় দীর্ঘদিন যুক্ত থাকা লিডসের ব্যবসায়িক আয় ও নিয়মিত অর্থপ্রবাহের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ আর্থিক পরিস্থিতির মধ্যে একপর্যায়ে পার্থক্য তৈরি হয় বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য। প্রাতিষ্ঠানিক সূত্রের দাবি, নিয়মিত অর্থপ্রবাহ থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানের তহবিল ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয় এবং অর্থ অন্যত্র স্থানান্তরের কারণে আর্থিক সংকট বাড়তে থাকে। তবে অর্থ স্থানান্তর বা অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে প্রকাশ্য নথিতে চূড়ান্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এর মধ্যে মালিকানা-সংক্রান্ত পুরোনো একটি মামলার কারণে লিডসের ওপর বড় অঙ্কের আর্থিক দায় তৈরি হয়। আদালতের নথি অনুযায়ী, পাওনা আদায়ের মামলায় লিডসের বিরুদ্ধে অর্থ পরিশোধের ডিক্রি কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২৪ সালে ঢাকার যুগ্ম জেলা জজ প্রথম আদালতের আদেশে লিডসের ব্যাংক হিসাব জব্দ, ব্যাংকআল্টিমাস সফটওয়্যার নিলামে বিক্রি এবং লিডস টাওয়ার নিলামে বিক্রির প্রক্রিয়া শুরু হয়।
আদালতের নথিতে ওই মামলায় ৭ কোটি ২৭ লাখ ৫৫ হাজার ৫৩৮ দশমিক ৭৮ মার্কিন ডলারের পাওনার তথ্য রয়েছে। পরবর্তী সময়ে সুদ ও অন্যান্য হিসাবের কারণে পাওনার পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। প্রকাশিত প্রতিবেদনে ২০২৪ সালে পাওনার পরিমাণ প্রায় ৮৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।
এই অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ব্যাংকআল্টিমাস নিলামে ওঠার পরিস্থিতি তৈরি হয়। আদালতের নথিতে সফটওয়্যারটির জন্য পাঁচ কোটি টাকার প্রস্তাবের উল্লেখ রয়েছে। লিডসকে এর চেয়ে বেশি মূল্য দিতে সক্ষম ক্রেতা আনার সুযোগ দেওয়া হলেও সে সময় তা করা সম্ভব হয়নি বলে আদালতের নথিতে উল্লেখ করা হয়।
আইনি বিরোধের প্রভাব পড়ে কর্মীদের ওপরও। ২০২৪ সালে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সাবেক কর্মকর্তাদের বক্তব্যের ভিত্তিতে বলা হয়, ২০১৮ সাল থেকে লিডসের কর্মীদের বেতন অনিয়মিত হয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে কর্মীদের মোট পাওনা প্রায় ৪০ কোটি টাকায় পৌঁছায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
সাবেক কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, একসময় নিয়মিত বেতন দেওয়া প্রতিষ্ঠানটিতে পরবর্তী সময়ে তিন থেকে চার মাস পর্যন্ত বেতন বিলম্বিত হতো। সাবেক কর্মকর্তা আরিফুর আমরান চৌধুরী তার নিজের পাওনা ১৭ লাখ টাকার বেশি বলে জানিয়েছিলেন।
লিডসের সাবেক প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা এস এম সাইফুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতি মাসে ৬ কোটি থেকে ৭ কোটি টাকা সংগ্রহ করত। একই সময়ে কর্মীদের মাসিক বেতন ছিল প্রায় ২ কোটি টাকা। অর্থ বিভাগের পক্ষ থেকে মালিকদের ব্যাংক ঋণ পরিশোধে অর্থ ব্যবহারের কথা জানানো হতো বলে তিনি দাবি করেন।
পরে প্রতিষ্ঠানটির তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মিজানুর রহমান আর্থিক নথি পর্যালোচনা করে দেখেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ব্যাংক হিসাব জব্দ হওয়ার আগে লিডস মাসে প্রায় ৪ কোটি থেকে ৫ কোটি টাকা পেত এবং কর্মীদের বেতন বাবদ ব্যয় ছিল প্রায় দেড় কোটি টাকা। তার বক্তব্য ছিল, নথিতে অর্থের উপস্থিতি দেখা গেলেও সেই অর্থ পাওয়া যাচ্ছিল না। অর্থ অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়ে থাকতে পারে বলেও তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন।
তবে এসব বক্তব্য সংশ্লিষ্ট সাবেক কর্মকর্তাদের দাবি। অর্থ সরিয়ে নেওয়া বা দেশের বাইরে পাঠানোর অভিযোগের পক্ষে প্রকাশ্য আদালত নথিতে চূড়ান্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
লিডসের আর্থিক সংকটের সময় প্রতিষ্ঠানটির প্রধান পণ্য ব্যাংকআল্টিমাসকে ঘিরে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় এর প্রভাব পড়ে সফটওয়্যার ব্যবহারকারী ব্যাংকগুলোর ওপরও। কোর ব্যাংকিং ব্যবস্থা ব্যাংকের হিসাব, লেনদেন, ঋণ, আমানত এবং অন্যান্য ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত থাকায় সফটওয়্যার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও কারিগরি সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, লিডসের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রযুক্তি কর্মী ওই সময় প্রতিষ্ঠান ছেড়ে চলে যান। এর ফলে ব্যাংকআল্টিমাসের রক্ষণাবেক্ষণ ও পরবর্তী উন্নয়ন নিয়ে ব্যবহারকারী ব্যাংকগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়।
পরবর্তীতে লিডসের মালিকানায় পরিবর্তন আসে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ওয়েস্টার্ন গ্রুপ লিডস করপোরেশনের শতভাগ শেয়ার অধিগ্রহণ করে। তবে তখনও ব্যাংকআল্টিমাসের মালিকানা নিয়ে মামলা চলছিল।
২০২৬ সালের ২৭ জুলাই আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ দেওয়ানি আপিল নম্বর ৪৬/২০২৫-এর রায় দেয় বলে লিডস করপোরেশন জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, আপিল বিভাগ নিম্ন আদালতের নিলাম ও ক্রোকসংক্রান্ত আদেশ বাতিল করেছে। এর ফলে ব্যাংকআল্টিমাসের মালিকানা ও মেধাস্বত্ব নিয়ে লিডসের আইনি অবস্থান নিশ্চিত হয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটি জানায়।
লিডস বর্তমানে জানিয়েছে, ব্যাংকআল্টিমাস দেশের ১৩টি সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকে ব্যবহৃত হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি ফিঙ্গিনএক্স নামে নতুন একটি সার্বজনীন ব্যাংকিং ব্যবস্থা তৈরির কথাও জানিয়েছে।
তবে লিডসের মালিকানা পরিবর্তনের পর নতুন একটি আইনি বিষয়ও সামনে রয়েছে। ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং প্রাইভেট লিমিটেডের বিরুদ্ধে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও অন্যদের সংশ্লিষ্ট সাতটি রিট মামলা সুপ্রিম কোর্টের কার্যতালিকায় রয়েছে। মামলাগুলোর নম্বর ৭৯৫৫/২০২০ থেকে ৭৯৬১/২০২০ পর্যন্ত। ২০২৫ সালের বিভিন্ন কার্যতালিকায় এসব মামলা ছিল এবং ২০২৬ সালেও মামলাগুলোর উপস্থিতি দেখা গেছে।
তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মামলা থাকা থেকে কর ফাঁকি বা অন্য কোনো অপরাধ প্রমাণিত হয় না। এসব মামলার প্রকৃত বিষয়, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য এবং আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আলাদাভাবে পর্যালোচনা ছাড়া ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এমন দাবি করা যায় না।
লিডসের বর্তমান পরিস্থিতিতে তাই দুটি বিষয় আলাদা করে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। একদিকে আদালতের রায়ের মাধ্যমে ব্যাংকআল্টিমাসের মালিকানা নিয়ে অনিশ্চয়তা দূর হওয়ার দাবি করা হয়েছে। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটির আগের আর্থিক সংকট, কর্মীদের বেতন বকেয়া এবং নিলাম পর্যন্ত গড়ানো মামলার প্রভাব পুরোপুরি কীভাবে কাটিয়ে ওঠা হয়েছে, সেটি যাচাইয়ের বিষয় হয়ে রয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, কোর ব্যাংকিং ব্যবস্থা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে শুধু সফটওয়্যারের মালিকানা নয়, প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা, প্রযুক্তি কর্মী, ব্যবস্থাপনা কাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। লিডসের ক্ষেত্রে এসব বিষয়ে অতীতের ঘটনাগুলো ব্যবহারকারী ব্যাংকগুলোর জন্য যথাযথ যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে।

