ট্রেডমিলে হাঁটা সহজ, কিন্তু দৌড়ানো শুরু করলেই অনেকে হাঁটু বা পায়ের গোছায় ব্যথা পান। কেউ আবার কয়েক মিনিটেই হাঁপিয়ে গিয়ে হাল ছেড়ে দেন। এর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সমস্যা শরীরের নয়, পদ্ধতির। সঠিক ভঙ্গি, উপযুক্ত গতি এবং ধাপে ধাপে অগ্রগতি জানা থাকলে ট্রেডমিলে দৌড়ানো নিরাপদ ও উপভোগ্য হয়ে ওঠে।
দৌড় শুরুর আগে প্রস্তুতি
ওয়ার্ম-আপ বাধ্যতামূলক। প্রথম ৫ মিনিট ধীর গতিতে হেঁটে শরীর গরম করুন। এতে পেশি ও জোড়া দৌড়ের জন্য তৈরি হয়।
সঠিক জুতা। দৌড়ের জন্য তৈরি কুশনযুক্ত জুতা পরুন। পুরোনো, ক্ষয়ে যাওয়া বা পাতলা সোলের জুতা হাঁটুতে বেশি চাপ ফেলে।
মেশিন যাচাই। বেল্ট ঠিকমতো টানটান আছে কি না এবং সেফটি কি কাজ করছে কি না দেখে নিন।
ট্রেডমিলে দৌড়ানোর সঠিক ভঙ্গি
১. সোজা হয়ে দাঁড়ান। মাথা ও কাঁধ সোজা রাখুন, সামনের দিকে তাকান। বেল্টের দিকে বা নিচে তাকালে ঘাড় ও পিঠে চাপ পড়ে।
২. কাঁধ শিথিল রাখুন। কাঁধ উঁচু বা শক্ত করে রাখবেন না।
৩. হাতের নড়াচড়া। কনুই প্রায় ৯০ ডিগ্রিতে ভাঁজ করে স্বাভাবিকভাবে সামনে-পেছনে দোলান।
৪. ছোট ও দ্রুত পদক্ষেপ। খুব লম্বা পদক্ষেপ নিলে পা বেশি জোরে মাটিতে পড়ে এবং হাঁটুতে ধাক্কা লাগে। ছোট পদক্ষেপ ভালো।
৫. পা নরমভাবে ফেলুন। পা যেন শরীরের একদম সামনে না পড়ে, বরং শরীরের নিচের কাছাকাছি পড়ে।
৬. হ্যান্ডেল ধরে দৌড়াবেন না। এতে ভঙ্গি নষ্ট হয় ও ব্যায়ামের কার্যকারিতা কমে। শুধু ওঠা-নামার সময় ধরুন।
৭. বেল্টের মাঝখানে থাকুন। একেবারে সামনে বা পেছনে চলে গেলে বিপদ হতে পারে।
নতুনদের জন্য গতি ও সময়ের নিয়ম
একজন নতুন দৌড়বিদের জন্য সবচেয়ে বড় ভুল হলো প্রথম দিনেই একটানা দৌড়ানোর চেষ্টা। বরং হাঁটা ও জগিং পালা করে শুরু করা বুদ্ধিমানের কাজ।
সপ্তাহ ১: ২ মিনিট জগিং, ২ মিনিট হাঁটা, এভাবে মোট ২০ মিনিট। সপ্তাহে ৩ দিন।
সপ্তাহ ২: ৩ মিনিট জগিং, ২ মিনিট হাঁটা, মোট ২০ থেকে ২৫ মিনিট।
সপ্তাহ ৩: ৫ মিনিট জগিং, ২ মিনিট হাঁটা, মোট ২৫ মিনিট।
সপ্তাহ ৪: ৮ থেকে ১০ মিনিট একটানা জগিং, মাঝে ২ মিনিট হাঁটা।
গতির সহজ নিয়ম হলো, দৌড়ানোর সময় যেন ছোট বাক্যে কথা বলতে পারেন। কথা বলা একেবারে অসম্ভব হলে গতি কমান। প্রতি সপ্তাহের লক্ষ্য বদলে যেতে পারে, নিজের শরীর অনুযায়ী ঠিক করুন।
ইন্টারভাল রানিং কী ও কেন
ইন্টারভাল রানিংয়ে দ্রুত দৌড় ও ধীর হাঁটা বা হালকা জগিং পালা করে করা হয়। উদাহরণ: ১ মিনিট দ্রুত, ২ মিনিট ধীর, এভাবে ১৫ থেকে ২০ মিনিট। এটি ব্যায়ামকে একঘেয়েমি থেকে বাঁচায় এবং সময় কম থাকলেও ভালো ব্যায়াম করা যায়। তবে নতুনরা প্রথম কয়েক সপ্তাহ পর এটি শুরু করুন।
হাঁটুর ব্যথা এড়ানোর কৌশল
- ধাপে ধাপে বাড়ান। সপ্তাহে সময় ও গতি দুটো একসঙ্গে বাড়াবেন না।
- বিশ্রামের দিন রাখুন। টানা প্রতিদিন দৌড়ালে জোড়া সেরে ওঠার সময় পায় না।
- ভালো কুশনিংয়ের মেশিন বেছে নিন। শক অ্যাবজর্পশন যত ভালো, হাঁটুর ওপর ধাক্কা তত কম।
- পেশি মজবুত করুন। স্কোয়াট ও লাঞ্জের মতো হালকা ব্যায়াম পায়ের পেশি শক্ত করে, যা হাঁটুকে সহায়তা করে।
- ব্যথা অগ্রাহ্য করবেন না। ক্লান্তি আর ব্যথা এক জিনিস নয়। তীক্ষ্ণ বা দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা হলে দৌড় বন্ধ করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
দৌড়ের জন্য কেমন ট্রেডমিল দরকার
নিয়মিত দৌড়ানোর জন্য মোটরের শক্তি, বেল্টের দৈর্ঘ্য ও কুশনিং ভালো থাকা জরুরি। কম শক্তির মোটর দৌড়ের চাপে দ্রুত গরম হয়ে যেতে পারে। কেনার আগে বিভিন্ন মডেল ও অনলাইনে ট্রেডমিল তালিকা মিলিয়ে নিজের ওজন ও ব্যবহারের ধরন অনুযায়ী মেশিন বাছুন।
সাধারণ ভুলগুলো
- ওয়ার্ম-আপ ছাড়াই দৌড়ে যাওয়া।
- খুব লম্বা পদক্ষেপ নেওয়া।
- হ্যান্ডেল ধরে দৌড়ানো।
- প্রথম দিনেই বেশি গতি বা বেশি সময় দেওয়া।
- দৌড়ের পর কুলডাউন না করা।
সাধারণ কিছু প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন: ট্রেডমিলে দৌড়ালে কি হাঁটুর ক্ষতি হয়? উত্তর: সঠিক ভঙ্গি, ভালো জুতা ও ধাপে ধাপে অগ্রগতি মেনে চললে ঝুঁকি কমে। আগে থেকে হাঁটুর সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
প্রশ্ন: ট্রেডমিলে ১ ডিগ্রি ঢাল কি দরকার? উত্তর: অনেকে বাইরের দৌড়ের মতো অনুভূতি পেতে সামান্য ঢাল ব্যবহার করেন। এটি ঐচ্ছিক, তবে নতুনরা শুরুতে সমতলেই অভ্যস্ত হোন।
প্রশ্ন: প্রতিদিন কতক্ষণ দৌড়ানো উচিত? উত্তর: নতুনদের জন্য সপ্তাহে ৩ দিন ২০ থেকে ৩০ মিনিটের মিশ্র হাঁটা-জগিং ভালো শুরু। পরে ধীরে বাড়ান।
প্রশ্ন: দৌড়ের পর পায়ের পেশিতে ব্যথা হলে কী করব? উত্তর: হালকা ব্যথা স্বাভাবিক। বিশ্রাম নিন, পানি পান করুন ও হালকা স্ট্রেচ করুন। ব্যথা তীব্র বা বেশি দিন থাকলে চিকিৎসকের কাছে যান।
শেষ কথা
ট্রেডমিলে দৌড়ানোর সাফল্য নির্ভর করে ধৈর্য ও সঠিক পদ্ধতির ওপর। সোজা ভঙ্গি, ছোট পদক্ষেপ, ধাপে ধাপে অগ্রগতি আর শরীরের সংকেত শোনা, এই চারটি মনে রাখলে আপনি ইনজুরি এড়িয়ে নিয়মিত দৌড়ের অভ্যাস গড়তে পারবেন।
স্বাস্থ্য সংক্রান্ত দ্রষ্টব্য: এই লেখা সাধারণ তথ্যের জন্য। কোনো শারীরিক সমস্যা থাকলে ব্যায়ামের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

