Tuesday, October 20, 2026

ইরানে পরমাণু কর্মসূচিতে হামলার ফল উল্টো হতে পারে

Share

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা চালালে তার ফল উল্টো হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, এই হামলা তেহরানকে গোপনে পারমাণবিক বোমা তৈরি বা অন্য গোষ্ঠীকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম চুরির দিকে ঠেলে দিতে পারে।

আজ বুধবার সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে উঠে আসে এমন বিশ্লেষণ।

এতে বলা হয়, ইরান দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে যে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনো ইচ্ছা তাদের নেই।

তবে ২০০২ সালে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও প্লুটোনিয়াম উৎপাদনের দুটি গোপন স্থাপনার তথ্য প্রকাশ হওয়ার পর থেকে আন্তর্জাতিক মহলে এ কর্মসূচি নিয়ে গভীর সন্দেহ তৈরি হয়।

২০১৫ সালে পারমাণবিক চুক্তির মাধ্যমে ইরানের কর্মসূচির ওপর কঠোর সীমাবদ্ধতা ও আন্তর্জাতিক তদারকি আরোপ করা হয়েছিল। কিন্তু ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নিলে চুক্তিটি কার্যত ভেঙে পড়ে এবং ইরান আবার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণসহ বিভিন্ন কার্যক্রম জোরদার করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের কাছে প্রায় ৪৪০ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত রয়েছে, যা প্রায় ৬০ শতাংশ বিশুদ্ধ।

এই ইউরেনিয়াম ব্যবহার করে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা তুলনামূলকভাবে সহজ। আর এটা নিয়েই উদ্বিগ্ন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্যাস থেকে ধাতব রূপে রূপান্তরের মাধ্যমে এই ইউরেনিয়ামকে আরও সমৃদ্ধ করে ১০টির বেশি পারমাণবিক ওয়ারহেড তৈরি করা সম্ভব।

গত বছর জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার অন্যতম কারণ ছিল এই ইউরেনিয়ামের মজুত ধ্বংস করা। ওই সময় ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’–এর আওতায় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে বাঙ্কার ধ্বংসকারী বোমা নিক্ষেপ করে যুক্তরাষ্ট্র।

ডোনাল্ড ট্রাম্প তখন দাবি করেছিলেন, ওই হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ হয়ে গেছে।

তবে পরে দেখা যায় পাহাড়ের নিচে গভীর ভূগর্ভে নির্মিত ইসফাহান ও নাতাঞ্জের মতো কিছু স্থাপনা পুরোপুরি ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি।

হামলার পর ইরান আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শকদের এসব স্থানে প্রবেশে বাধা দেয়।

ফলে ৪৪০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত কোথায় রয়েছে বা সেখানে কী কাজ চলছে—সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাটি নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারছে না।

আইএইএ’র সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করেছে কি না বা সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোতে কত ইউরেনিয়াম রয়েছে, তা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

তবে সংস্থাটির মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি বলেছেন, এখন পর্যন্ত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনো কাঠামোগত কর্মসূচির প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

বদলে যেতে পারে পরিস্থিতি

বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, বর্তমান সংঘাত সেই অবস্থান বদলে দিতে পারে।

বিশেষ করে ইরানের ৪৭ বছরের শাসনব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে হামলা এবং সর্বোচ্চ নেতা খামেনিকে হত্যার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

এ বিষয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার মিডলবেরি ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ জেফ্রি লুইস গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘এটা এক ধরনের বড় ঝুঁকির খেলা। যদি হামলার পর ইরানে সরকার টিকে থাকে, তাহলে আবার এই কর্মসূচি গড়ে তোলার জন্য হাজারো মানুষ আছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই প্রযুক্তি নতুন কিছু নয়। দশকের পর দশক ধরে চলছে। হামলার পর টিকে গেলে ইরান সম্ভবত উত্তর কোরিয়ার মতো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে, যে বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তি আছে, সেখানে পারমাণবিক অস্ত্রই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা।’

আর্মস কন্ট্রোল অ্যাসোসিয়েশনের অস্ত্র বিস্তার প্রতিরোধ বিষয়ক পরিচালক কেলসি ড্যাভেনপোর্ট বলেন, ‘এই হামলার পর ইরানের ভেতরে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পক্ষে চাপ বাড়তে পারে।’

তার মতে, যদি ইরানে বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতন হয় বা গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, তাহলে সেখানে থাকা উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

এ ছাড়া, ইরানের ভেতরে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে ইউরেনিয়াম চুরি বা পাচারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন ড্যাভেনপোর্ট।

তিনি বলেন, ‘তখন স্থলবাহিনী পাঠানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ তৈরি হবে।’

এ অবস্থায় পারমাণবিক সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি তৈরি নিয়ে সতর্ক করে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘এ নিয়ে এখনো মার্কিন প্রশাসনে যথেষ্ট আলোচনা দেখা যাচ্ছে না।’

Read more

Local News