Tuesday, November 3, 2026

১৩ নভেম্বর পৃথিবী ধ্বংস হবে? ৬৬ বছর আগের সেই ভবিষ্যদ্বাণী কতটা সত্য?

Share

পৃথিবীর ধ্বংস নিয়ে নানা মুনির নানা মত। যুগ যুগ ধরে বিজ্ঞজনেরা বলেছেন কবে, কখন, কীভাবে পৃথিবী ধ্বংস হবে। তাই পৃথিবী ধ্বংসের কথা এখন অনেকের কাছে ‘কাল্পনিক’ মনে হতে পারে। অনেকে এড়িয়ে যেতে পারেন এই লেখা। তবে এখানে দেওয়া হয়েছে এক ভিন্ন তথ্য, যা আপনাকে একটু হলেও অবাক করতে পারে।

হ্যাঁ, আর মাত্র দিন দশেক বাকি! ৬৬ বছর আগে একদল বিজ্ঞানী হিসাব কষে বলেছিলেন, ২০২৬ সালের ১৩ নভেম্বর মানবজাতির জন্য নেমে আসবে মহাবিপর্যয়! পৃথিবীর জনসংখ্যা এতটাই বেড়ে যাবে যে মানুষ নিজেদের চাপেই পিষ্ট হবে।

দিনটি যত এগিয়ে আসছে, ততই মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, তাহলে কি সত্যিই পৃথিবী ধ্বংসের মুখে? কিন্তু ভয় পাওয়ার কিছু নেই, সময়ের সঙ্গে জন্মহার কমে যাওয়ায় বদলে গেছে সেই হিসাব।

কীভাবে ভুল প্রমাণিত হলো বিজ্ঞানীদের এই ভবিষ্যদ্বাণী তাই তুলে ধরা হবে এই লেখায়।

১৯৬০ সালে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী সায়েন্স একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিল। শিরোনাম ছিল, ‘ডুমসডে: ফ্রাইডে, ১৩ নভেম্বর, এডি ২০২৬’। অর্থাৎ ২০২৬ সালের ১৩ নভেম্বর শুক্রবার পৃথিবী ধ্বংসের দিন!

গবেষণাপত্রে বলা হয়েছিল, ওই দিন পৃথিবীর জনসংখ্যা প্রায় সীমাহীন পর্যায়ে পৌঁছে যাবে। মানুষের সংখ্যা এতটাই বেড়ে যাবে যে, শেষ পর্যন্ত মানবজাতি নিজেরাই নিজেদের ধ্বংসের কারণ হবে।

শুনতে কল্পবিজ্ঞানের গল্প মনে হলেও গবেষণাটি সে সময় বেশ গুরুত্ব পেয়েছিল। এমনকি, কয়েক দশক ধরে এর গাণিতিক হিসাবও যথেষ্ট নির্ভুলই মনে হচ্ছিল।

গবেষণাটির লেখক ছিলেন অস্ট্রীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন অধ্যাপক ও সাইবারনেটিকস বিশেষজ্ঞ হেইঞ্জ ফন ফর্স্টার এবং তার দুই শিক্ষার্থী প্যাট্রিসিয়া এম মোর ও লরেন্স ডব্লিউ অ্যামিওট।

তাদের যুক্তি ছিল, পৃথিবীতে জনসংখ্যা কেবল দ্রুত বাড়ছে না, বরং বৃদ্ধির গতিও ক্রমেই বাড়ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যেতে পারে যে, মানুষ খাবারের অভাবে না মরে একে অন্যের চাপে পিষ্ট হবে।

তবে ১৩ নভেম্বর এলেই যে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে, এমন আশঙ্কার কারণ নেই। কারণ, সময়ের সঙ্গে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সেই হিসাব বদলে গেছে।

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, কীভাবে তৈরি হয়েছিল এই ভবিষ্যদ্বাণী? আর কেনই-বা ৬ দশকের বেশি সময় পর তা ভুল প্রমাণিত হতে শুরু করল?

বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে পৃথিবীর জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছিল। এতে খাদ্য, পানি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের সংকট নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। কারণ, এভাবে জনসংখ্যা বাড়তে থাকলে একসময় পৃথিবীর সম্পদ মানুষের চাহিদা মেটাতে পারবে না। আর এই ধারণা তখন খুব জনপ্রিয় হয়েছিল।

এই ধারণার পেছনে ছিল ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ টমাস ম্যালথাসের তত্ত্ব। তার মতে, মানুষের জনসংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়তে পারে। কিন্তু খাদ্য উৎপাদন সেই হারে বাড়ে না। ফলে একসময় খাদ্যসংকট দেখা দেয়।

তবে অস্ট্রীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন অধ্যাপক ফন ফর্স্টার ও তার সহলেখকেরা মানুষের ক্ষেত্রে বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখেছিলেন।

তাদের মতে, মানুষ কেবল খাবার সংগ্রহ বা বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করে না। মানুষ একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে, সংঘবদ্ধ হতে পারে ও যৌথভাবে সমস্যার সমাধান করতে পারে। জনসংখ্যা বাড়লে সহযোগিতার সুযোগও বেড়ে যায়।
তাদের ধারণা ছিল, এই সহযোগিতার ক্ষমতার কারণে মানুষের সংখ্যা সাধারণ হারে নয়, বরং আরও দ্রুত বাড়তে পারে।

তারা এই যুক্তিকে বিশ্বাসযোগ্য করতে গবেষণায় দুই হাজার বছরের জনসংখ্যার ২৪টি হিসাব ব্যবহার করেছিলেন। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছিলেন, তখনকার মানুষের সংখ্যা আগের অনুমানকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

এরপর তারা সেই হিসাব ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োগ করেন। তাদের সেই হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে পৃথিবীর জনসংখ্যা প্রায় ‘অসীম’ পর্যায়ে পৌঁছানোর কথা।

গবেষণাপত্রটি প্রকাশের পরপরই আলোচনার ঝড় ওঠে। টাইম ও দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর মতো সংবাদমাধ্যমেও খবরটি প্রকাশিত হয়। এমনকি সেসময় বিষয়টি নিয়ে কার্টুনও প্রকাশিত হয়েছিল।

অনেকেই গবেষণাটিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ভয়াবহতা বোঝানোর জন্য ব্যঙ্গাত্মক প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেছিলেন। তবে বিষয়টি কেবল হাসিঠাট্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।

গণিতবিদ ও জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞদের অনেকে গবেষণাটির সমালোচনা করেন। কেউ কেউ একে হাস্যকর ও অবাস্তব বলে মন্তব্য করেন।

সেসব সমালোচনার জবাবে গবেষকেরা নিজেদের হিসাবের পক্ষে যুক্তি দেন। ১৯৬০ থেকে ১৯৮০-এর দশক পর্যন্ত জীববিজ্ঞান, পরিবেশবিজ্ঞান ও জনসংখ্যাবিষয়ক বিভিন্ন বইয়ে তাদের গবেষণার উল্লেখ পাওয়া যায়। 

কয়েকটি সরকারি আলোচনা ও আদালতের মামলাতেও জনসংখ্যা বৃদ্ধির যুক্তি হিসেবে গবেষণাটি উদ্ধৃত হয়েছিল। অবশ্য এর পেছনে কারণ ছিল। একটি কারণ, গবেষণাটির গাণিতিক হিসাব কয়েক দশক ধরে বাস্তব জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে বেশ ভালোভাবেই মিলে যাচ্ছিল।

শুধু তাই নয়—১৯৭০ ও ১৯৮০ এর দশকে অনেক জনসংখ্যাবিদের পূর্বাভাসের চেয়েও তাদের হিসাব নির্ভুল ছিল।

পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে ১৯৯৩ সালের দিকে। তখন থেকে পৃথিবীর প্রকৃত জনসংখ্যা গবেষকদের পূর্বাভাসের তুলনায় পিছিয়ে পড়তে থাকে। এর প্রধান কারণ ছিল জন্মহার কমে যাওয়া।

১৯৬০ সালের তুলনায় বর্তমানে বিশ্বে জন্মহার অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। অর্থাৎ আগের তুলনায় পরিবারগুলোয় সন্তান জন্মের সংখ্যা কমেছে। ফলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতিও কমেছে।

মজার বিষয় হলো—গবেষকরা যে বিপদ এড়াতে জন্মহার কমানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন, কয়েক দশক পর পৃথিবী অনেকটা সেই পথেই এগিয়েছে।

গবেষকদের মতে, মানুষের আয়ু কমানোর প্রয়োজন নেই। বরং সবাই মিলে জন্মহার কমাতে পারলে জনসংখ্যার চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব।

তাহলে ২০২৬ সালের ১৩ নভেম্বর কী হবে? গবেষণাপত্রের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ওই দিন মানবজাতির ধ্বংস হওয়ার কথা। কিন্তু বর্তমান জনসংখ্যার বাস্তবতা বলছে, সেই আশঙ্কার কোনো ভিত্তি নেই।

তবু ৬৬ বছর আগের এই গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আছে। বিজ্ঞানসম্মত হিসাবও সব সময় ভবিষ্যতের সঠিক চিত্র তুলে ধরতে পারে না। কারণ মানুষের আচরণ, সামাজিক পরিবর্তন ও নানা পরিস্থিতি সময়ের সঙ্গে বদলে যায়।

তাই ১৩ নভেম্বর নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।

সূত্র: সায়েন্স ম্যাগাজিন, সায়েন্স ডেইলি, টাইম, নিউইয়র্ক পোস্ট, দ্য কনভারসেশন

Read more

Local News