Wednesday, February 4, 2026

দেশের পোশাকশিল্পে নতুন চ্যালেঞ্জ ইইউ-ভারত বাণিজ্যচুক্তি

Share

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও ভারতের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) হওয়ার ফলে ইউরোপের বাজারে ভারতের পোশাক রপ্তানিকারকেরা শুল্কমুক্ত সুবিধা পেতে যাচ্ছেন। এর ফলে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকেরা কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

গত মঙ্গলবার ঘোষিত এই চুক্তিটি ইউরোপিয়ান কাউন্সিল, ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট এবং ভারতের পার্লামেন্টের অনুমোদন সাপেক্ষে ২০২৭ সালে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।

চুক্তিটি কার্যকর হলে ইউরোপের বাজারে ভারতীয় পোশাকের ওপর বিদ্যমান ১২ শতাংশ শুল্ক উঠে গিয়ে তা শূন্যে নেমে আসবে। এর ফলে বাংলাদেশের পোশাক খাত এত দিন যে সুবিধা পেয়ে আসছিল, তা হুমকির মুখে পড়তে পারে।

এই চুক্তির আওতায় ইইউ ২০৩২ সালের মধ্যে ভারতে তাদের রপ্তানি দ্বিগুণ করতে চায়। বিনিময়ে ইইউ সাত বছরের মধ্যে ভারত থেকে আমদানিকৃত ৯৯ দশমিক ৫ শতাংশ পণ্যের ওপর শুল্ক প্রত্যাহার করবে। এতে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর অনুকূলে প্রায় ৪০০ কোটি ইউরোর শুল্ক সাশ্রয় হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বর্তমানে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) হিসেবে ইইউতে শুল্কমুক্ত পোশাক রপ্তানি করছে। চলতি বছরের নভেম্বরে এলডিসি থেকে উত্তরণ বা গ্র্যাজুয়েশন হলেও পরবর্তী তিন বছর পর্যন্ত এই সুবিধা অব্যাহত থাকবে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বিশেষ করে পোশাক খাতের জন্য এর প্রভাব হবে উল্লেখযোগ্য।’ তিনি সতর্ক করে বলেন, ভারত একবার শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পেলে ইইউ বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাবে।

১৯৭৫ সাল থেকে ইইউর দেওয়া বাণিজ্যিক সুবিধার ওপর ভর করে বাংলাদেশ চীনের পর ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। ডেনিম, ট্রাউজার্স ও টি-শার্টের মতো কিছু ক্ষেত্রে চীনকেও ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ। শিল্পমালিকদের তথ্য বলছে, ইউরোপে প্রতি তিনজনের একজন বাংলাদেশের তৈরি ডেনিম ট্রাউজার পরেন।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির ৫০ শতাংশের বেশি গেছে ইইউ দেশগুলোতে, যার আর্থিক মূল্য ১৯ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলার।

এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর বাংলাদেশ যদি দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা জিএসপি প্লাস সুবিধা নিশ্চিত করতে না পারে, তবে ২০২৯ সালের পর ইউরোপে পোশাক রপ্তানিতে প্রায় সাড়ে ১২ শতাংশ শুল্ক গুনতে হবে। অন্যদিকে ভারত ও ভিয়েতনাম মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে শূন্য শুল্ক সুবিধা ভোগ করতে থাকবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ট্যারিফ ও বাণিজ্যনীতির পরিবর্তনের পর এখন পোশাক রপ্তানিকারকদের জন্য প্রধান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে ইউরোপ। ব্রোকারেজ ফার্ম ব্র্যাক ইপিএল এক গবেষণা নোটে বলেছে, ‘বাজারে হঠাৎ অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে দরকষাকষির ক্ষমতা এখন ইইউর ক্রেতাদের হাতে। তারা সরবরাহকারীদের ওপর কঠিন শর্ত ও কম সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহের চাপ দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ওপর প্রভাব ফেলবে।’

বিজিএমইএর পরিচালক ফয়সাল সামাদ বলেন, ইইউ-ভারত চুক্তির প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে না পড়লেও ধীরে ধীরে তা অনুভূত হবে। তিনি বলেন, কাঁচা তুলা ও দক্ষ জনশক্তির সহজলভ্যতার পাশাপাশি ভারত সরকারের আর্থিক ও নীতিসহায়তা ভারতীয় পোশাক খাতের বড় শক্তি।

তবে তিনি মনে করেন, এখনো বাংলাদেশের কিছু সুবিধা রয়েছে। নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা এবং ডেনিম, সোয়েটার, টি-শার্ট, ট্রাউজার, আন্ডারগার্মেন্টস ও ওভেন শার্টের মতো পণ্যে বাংলাদেশের শক্ত অবস্থান আছে। রপ্তানিকারকরা এখন উচ্চমূল্যের পণ্য তৈরির দিকে ঝুঁকছেন এবং সরকারও ব্রাসেলসের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউরোপের বাজারে অবস্থান ধরে রাখতে বাংলাদেশকে এখনই বাণিজ্য কূটনীতি জোরদার করতে হবে।

সিপিডির মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের উচিত ইইউ থেকে জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া এবং বাজার সুবিধা ধরে রাখতে দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির প্রস্তুতি নেওয়া।’

তিনি আরও বলেন, ভারতের নতুন পোশাক নীতি ইঙ্গিত দেয় যে তারা এই খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ ও প্রসারের পরিকল্পনা করছে। তুলার নিজস্ব জোগান থাকায় ভারত স্বাভাবিকভাবেই সুবিধাজনক অবস্থানে।

নারায়ণগঞ্জভিত্তিক নিটওয়্যার কারখানা প্লামি ফ্যাশনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুল হক বলেন, ভারতের এই সুবিধার কারণে কম দামে পণ্য সরবরাহে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরও কমবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রতিদন্দ্বীরা শুল্কমুক্ত সুবিধা পেলেও বাংলাদেশকে যদি শুল্ক দিতে হয়, তবে ক্রেতারা আরও কম দাম চাইবে এবং কার্যাদেশ অন্য দেশে সরিয়ে নিতে উৎসাহিত হবে।

সতর্ক হওয়ার সময় এখনই
ইইউ-ভারত চুক্তিকে বাংলাদেশের জন্য ‘সতর্কবার্তা’ বা ওয়েক-আপ কল হিসেবে অভিহিত করছেন। তারা সরকারকে দ্রুত ইউরোপের বাজারে অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা ধরে রাখার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, স্থানীয় শিল্পের জন্য কর সুবিধা ও প্রণোদনার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম দীর্ঘদিনের নীতিগত ব্যর্থতার সমালোচনা করে বলেন, প্রতিদন্দ্বীরা যেখানে এফটিএ বা জিএসপি প্লাস সুবিধা নিশ্চিত করেছে, সেখানে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা রাশিয়ার সঙ্গে শুল্কমুক্ত সুবিধার জন্য বাণিজ্য চুক্তির অনুরোধ জানালেও তা হয়নি। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পেছানোর দাবিও সরকার আমলে নেয়নি।

রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‌্যাপিড) চেয়ারম্যান ও বাণিজ্য বিশ্লেষক মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক বলেন, ইইউ-ভারত চুক্তি বাস্তবায়িত হলে ইউরোপে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের ঝুঁকি আরও তীব্র হবে।

Read more

Local News